বাংলাদেশে দুর্নীতির প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগও নতুন মাত্রা পায়। এক সরকার বিদায় নেওয়ার পর পরবর্তী সরকার পূর্ববর্তী সময়ের অনিয়ম-দুর্নীতির হিসাব চায়। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে, যখন তদন্ত ও বিচার রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে থেকে আইনের শাসনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য সেই আলোচনাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

সংসদে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে সংঘটিত দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। তাঁর বক্তব্যের ভিত্তি হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫। সংসদে সরকারি দলের সদস্যদের প্রকাশ্য সমর্থন এই বক্তব্যকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

টিআইবির জরিপে উঠে এসেছে যে, সেবা খাতে দুর্নীতির পরিমাণ আগের তুলনায় বেড়েছে। পাসপোর্ট, ভূমি, বিআরটিএ, বিচারসেবা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাসহ বিভিন্ন খাতে নাগরিকদের ঘুষ দিতে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না- এমন অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন অধিকাংশ সেবাগ্রহীতা। এসব তথ্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং রাষ্ট্রের জন্য সতর্কবার্তা।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। টিআইবির জরিপ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, উপদেষ্টা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক তদন্তের প্রতিবেদন নয়। এটি নাগরিকদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সেবা খাতের দুর্নীতির একটি সামগ্রিক চিত্র। ফলে এই জরিপকে তদন্তের প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা সরকারের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণের চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে নয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কয়েকজন উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও সহকারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। কিছু অভিযোগে দুদক অনুসন্ধানও শুরু করেছিল। আবার কিছু কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। এসব ঘটনা দেখায় যে অভিযোগ একেবারে ভিত্তিহীন ছিল না। কিন্তু অভিযোগ এবং অপরাধ- এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোনো অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের একমাত্র গ্রহণযোগ্য উপায় হলো নিরপেক্ষ তদন্ত।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক কয়েকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তিও তদন্তের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, শুধু অন্তর্বর্তী সরকার নয়; আওয়ামী লীগ সরকারের সময়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এবং বর্তমান সরকারের সময়- যেখানেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, সবকিছুরই তদন্ত হওয়া উচিত। এই অবস্থান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই যদি শুধু একটি নির্দিষ্ট সময় বা রাজনৈতিক পক্ষকে ঘিরে আবর্তিত হয়, তাহলে জনগণের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। আইনের শাসনের মূল দর্শন হলো- সবাই আইনের কাছে সমান। রাষ্ট্র যদি এই নীতি থেকে বিচ্যুত হয়, তাহলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানও রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে পড়ে।

এখানে আরেকটি বাস্তব প্রশ্ন সামনে আসে। যে দুদকের মাধ্যমে তদন্তের কথা বলা হচ্ছে, সেই প্রতিষ্ঠান কি বর্তমানে পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে? সাম্প্রতিক সময়ে কমিশনের নেতৃত্ব নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একটি স্বাধীন ও কার্যকর দুর্নীতি দমন কমিশন ছাড়া উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত সম্ভব নয়। তাই তদন্তের আগে দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

বাংলাদেশে দুর্নীতির সমস্যা কোনো এক সরকারের সৃষ্টি নয়। এটি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব, জবাবদিহির অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার ফল। ফলে একটি সরকারের সময় দুর্নীতি বেড়েছে বা কমেছে- এই প্রশ্নের পাশাপাশি আরও বড় প্রশ্ন হলো, দুর্নীতি প্রতিরোধে কী ধরনের কাঠামোগত সংস্কার করা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও সংস্কারের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ, নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি বাড়ানোর মতো উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এসব উদ্যোগের অনেকগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি। এই ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায় সেই সরকার এড়াতে পারে না।

একইভাবে বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য। যদি বর্তমান সময়ে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তবে সেটিও সমান গুরুত্বে তদন্ত হতে হবে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে তদন্তের নীতি পরিবর্তিত হলে জনগণের আস্থা কখনোই প্রতিষ্ঠিত হবে না।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াইয়ের জন্য শুধু তদন্তই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক সংস্কার, তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর প্রয়োগ, সংসদীয় তদারকি এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বিচার বিভাগ ও তদন্ত সংস্থার ওপর রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

দুর্নীতির অভিযোগকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে তা সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে। কারণ এতে প্রকৃত দুর্নীতিবাজ যেমন অনেক সময় বিচারের বাইরে থেকে যায়, তেমনি নির্দোষ ব্যক্তিরাও রাজনৈতিক বিতর্কের শিকার হন।

এই বাস্তবতায় সরকারের সামনে একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। যদি সত্যিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে চায়, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের অভিযোগ তদন্তের পাশাপাশি অতীত ও বর্তমান- সব সময়ের অভিযোগ একই মানদণ্ডে তদন্তের উদ্যোগ নিতে হবে। আইনের প্রয়োগে কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারের জন্য আলাদা মানদণ্ড থাকতে পারে না।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জবাবদিহি কোনো সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য শর্ত। তাই তদন্তের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সত্য উদ্‌ঘাটন, দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিব্রত করা নয়, বরং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

সবশেষে বলা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ যদি সুনির্দিষ্ট হয়, তবে তার তদন্ত অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু সেই তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে একটি মৌলিক নীতির ওপর- একই মানদণ্ড সবার জন্য প্রযোজ্য কি না। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের অভিযোগ এবং বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ- সবকিছুরই নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও আইনি প্রক্রিয়ায় তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। তবেই দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান রাজনৈতিক স্লোগান থেকে বেরিয়ে একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হবে। জনগণও তখন বিশ্বাস করবে, বাংলাদেশে আইনের শাসন কেবল উচ্চারিত শব্দ নয়, বাস্তবেরও প্রতিফলন।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক