অযত্ন, অবহেলা ও দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বড়ইবাড়ী হাট-বাজার। সামান্য বৃষ্টিতেই হাটের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়ছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। পাশাপাশি হাটের সরকারি জমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় সংকুচিত হচ্ছে বাজারের পরিসর। ফলে ধীরে ধীরে এই ঐতিহ্যবাহী হাট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা। এতে একদিকে যেমন স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে সরকারও রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এলাকাবাসী, ক্রেতা-বিক্রেতা ও বাজার কমিটি সূত্রে জানা গেছে, কালিয়াকৈর উপজেলার পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী হাট-বাজারগুলোর মধ্যে বড়ইবাড়ী অন্যতম। এটি মূলত সাপ্তাহিক গ্রামীণ হাট হলেও প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত এখানে বাজার বসে। একসময় এই হাটে কাপড়, তৈজসপত্র, শাকসবজি, আম, কাঁঠাল, লিচুসহ বিভিন্ন ফলমূল, ধান-চাল, হাঁস-মুরগি, মাছ, কাঠ, অলংকার, রুটি-মিষ্টিসহ নানা পণ্যের ব্যাপক বেচাকেনা হতো। আশপাশের শতাধিক গ্রামের মানুষ এই হাটের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।

তবে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে হাটের পরিবেশ নষ্ট হওয়ায় বর্তমানে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতি কমে গেছে। হাটের জমির একটি অংশ দখল হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পানি জমে হাটের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক উন্নয়নকাজের কারণে হাটের জায়গা নিচু হয়ে যাওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বর্ষাকালে এই জলাবদ্ধতা অনেকটা স্থায়ী রূপ নেয়।

হাটের মাঝখানে থাকা একটি টয়লেট নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, টয়লেটের বর্জ্য উপচে বাইরে বেরিয়ে আসায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের নাক-মুখ চেপে হাটে চলাচল ও কেনাবেচা করতে হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ইজারাদার, বাজার বণিক সমিতি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

এদিকে, একসময় বড়ইবাড়ী হাটে কাঁঠাল ও কাঠের বড় বাজার বসত। বর্তমানে এসব পণ্যের একটি বড় অংশ পৃথক দুটি স্থানে ব্যক্তিগত জমিতে চলে গেছে। এতে ঐতিহ্যবাহী হাটটির বাণিজ্যিক গুরুত্ব কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হাটের ইজারাদার জহির খান বলেন, প্রায় ১৫ লাখ টাকা দিয়ে তিনি হাটটি ইজারা নিয়েছেন। বাজারের বেহাল অবস্থার বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। টয়লেটের বর্জ্য কিছুদিন পরপর পরিষ্কার করা হয় এবং আগামী দু-এক দিনের মধ্যে আবারও পরিষ্কার করা হবে। এছাড়া কাঁঠাল ও কাঠের বাজার অন্যত্র চলে যাওয়ার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। এ অবস্থায় বিপুল টাকা দিয়ে হাট ইজারা নিয়ে তারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলেও জানান তিনি।

বড়ইবাড়ী বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক উজ্জল খান বলেন, বাজারের রাস্তা, শেড ও ড্রেন নির্মাণের জন্য এর আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে আবেদন করা হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে একটি শেড ও অল্প কিছু রাস্তার কাজ হলেও বড় ধরনের আর কোনো উন্নয়ন হয়নি। তিনি দ্রুত হাটের সার্বিক উন্নয়ন ও সংস্কারের দাবি জানান।

স্থানীয় চাপাইর ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মুখলেছ মৃধা জানান, বড়ইবাড়ী হাটটি বহু বছরের পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী। কিন্তু বর্তমানে এর অবস্থা খুবই নাজুক। হাটের উন্নয়নের জন্য গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমানের সুপারিশ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম ফখরুল হোসাইন জানান, বড়ইবাড়ী হাটের উন্নয়নের জন্য একটি আবেদন পাওয়া গেছে। হাটের উন্নয়নকাজের জন্য স্টিমেট তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। খুব শিগগিরই সেখানে উন্নয়নকাজ শুরু হবে।

স্থানীয় ক্রেতা-বিক্রেতা ও এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত হাটটি দখলমুক্ত করে জলাবদ্ধতা নিরসন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন, স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত ও প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হলে আবারও বড়ইবাড়ী হাট তার পুরোনো ঐতিহ্য ও জৌলুশ ফিরে পেতে পারে। একই সঙ্গে হাটের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়লে সরকারের রাজস্বও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}