২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি। ঢাকার গুলশানে গৃহবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে পৌঁছেছিল জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক সংবাদ—তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো আর নেই।
মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাত্র ৪৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন কোকো। কয়েক দিন পর দেশে আনা হয় তার মরদেহ। ২৭ জানুয়ারি ঢাকার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় তার নামাজে জানাজা। রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত সেই সময়েও জানাজায় মানুষের যে ঢল নেমেছিল, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
কোকোর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক ছিল না; এটি ছিল এমন এক মানুষের বিদায়, যিনি জীবনের বড় একটি সময় কাটিয়েছেন প্রচারের আড়ালে। ক্ষমতার কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি থেকেও ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অনেকটাই অন্তর্মুখী ও প্রচারবিমুখ।
জন্মের পরই যুদ্ধের বাস্তবতা
আরাফাত রহমান কোকোর জন্ম ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট। জন্মের মাত্র দেড় বছরের মধ্যে বাংলাদেশ প্রবেশ করে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ অধ্যায়ে।
১৯৭১ সালে তার বাবা জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং চট্টগ্রাম থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে শিশু কোকো মা খালেদা জিয়া ও বড় ভাই তারেক রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি হন।
ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দিদশার সেই সময়টি তার শৈশবের এক নির্মম অধ্যায়। বয়স তখন এতটাই কম যে বন্দিত্বের অর্থ বোঝার মতো মানসিক পরিপক্বতা তার ছিল না। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেন—তার শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি দেশের জন্ম, একটি পরিবারের সংগ্রাম এবং অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস।
বারবার বিয়োগান্তকতার মুখোমুখি এক জীবন
কোকোর জীবনে রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হয়ে ফিরে এসেছে।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার সময় তার বাবা জিয়াউর রহমানও বন্দিত্বের মুখোমুখি হন। পরবর্তীতে তিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন। তখন কোকো ছিলেন মাত্র ছয় বছরের শিশু।
এরপর ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে জিয়াউর রহমান নিহত হলে কোকোর বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর। এত অল্প বয়সে বাবাকে হারানোর শোক তার জীবনে গভীর ছাপ ফেলে।
২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি গ্রেপ্তার হন। কারাবাসের পর ২০০৮ সালের ১৭ জুলাই মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় বসবাস শুরু করেন।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে মাত্র ৪৫ বছর বয়সেই তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়।
ক্ষমতার সন্তান, অথচ ক্ষমতার প্রদর্শনীতে অনাগ্রহী
আরাফাত রহমান কোকো ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। চাইলেই পারিবারিক রাজনৈতিক প্রভাবকে সামনে রেখে নিজেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন।
কিন্তু তার ব্যক্তিত্বের অন্যতম আলোচিত বৈশিষ্ট্য ছিল প্রচারবিমুখতা। রাজনীতির মঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পরিবর্তে তিনি ক্রীড়াঙ্গণের সঙ্গে যুক্ত হন।
বিশেষ করে ক্রিকেট ছিল তার অন্যতম প্রধান আগ্রহ ও কর্মক্ষেত্র। এখান থেকেই শুরু হয় তার জীবনের একটি ভিন্ন অধ্যায়।
ক্রিকেটে কোকোর নীরব ভূমিকা
২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় কোকো দেশের ক্রিকেট অবকাঠামো ও বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের উন্নয়নে কাজ করেন।
সেই সময় বাংলাদেশের ক্রিকেট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছিল। জাতীয় দলের সাফল্যের পাশাপাশি নতুন ক্রিকেটার তৈরির জন্য প্রয়োজন ছিল একটি কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কাঠামো।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ডেভেলপমেন্ট কমিটির দায়িত্বে থেকে বয়সভিত্তিক ক্রিকেট ও খেলোয়াড় তৈরির কার্যক্রমে তিনি যুক্ত ছিলেন। তার সময়ের এই উদ্যোগগুলো পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রতিভা বিকাশের ধারাকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।
ক্ষমতা ছিল, কিন্তু পদলোভন ছিল না
কোকোর সংগঠকসত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—তিনি চাইলে ক্রিকেট প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারতেন। তার পারিবারিক রাজনৈতিক প্রভাবও ছিল।
কিন্তু তিনি সর্বোচ্চ পদকে লক্ষ্য না করে দায়িত্বের জায়গা থেকেই কাজ করার চেষ্টা করেন। ক্রিকেট প্রশাসনে বিভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও তার সংগঠক হিসেবে পরিচিতির অংশ হয়ে ওঠে।
ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা আর ক্ষমতার প্রদর্শন করা যে এক বিষয় নয়—কোকোর কর্মকাণ্ডে তার একটি দৃষ্টান্ত দেখা যায়।
মিরপুরের ক্রিকেট অবকাঠামো ও আধুনিকায়নের ভাবনা
বাংলাদেশের ক্রিকেটে অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা সেই সময় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছিল। বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে মাঠে পানি জমে যাওয়া ছিল ক্রিকেট আয়োজনের অন্যতম বড় সমস্যা।
মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামকে আধুনিক আন্তর্জাতিক ভেন্যু হিসেবে গড়ে তুলতে উন্নত ড্রেনেজসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীকালে এই মাঠই বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক ভেন্যুতে পরিণত হয়।
ক্রিকেটকে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক না রেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসে। সিলেট, খুলনা, রাজশাহী ও বগুড়ার মতো শহরে ক্রিকেট অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা ছিল সেই বৃহত্তর বিকেন্দ্রীকরণ ভাবনার অংশ।
চান্দু স্টেডিয়াম: একটি স্মরণীয় সিদ্ধান্ত
বগুড়ার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যুর নামকরণ নিয়েও কোকোর সংগঠকসত্তার প্রসঙ্গ আলোচিত হয়।
তার বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার। পারিবারিক আবেগকে সামনে রেখে স্টেডিয়ামের নাম তার বাবের নামে করার সুযোগ থাকলেও বগুড়ার স্টেডিয়ামের নাম দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ চান্দুর নামে।
অনেকের কাছে এই সিদ্ধান্ত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান এবং ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
ক্রিকেটে পেশাদারিত্বের ভাবনা
বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক মানের কাঠামোয় নিয়ে যেতে বিদেশি কোচ, ট্রেনার ও ফিজিওদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তখন গুরুত্ব পাচ্ছিল।
ক্রিকেটকে শুধু আবেগের জায়গায় না রেখে পেশাদার ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার চিন্তাও গুরুত্ব পায়। কোচিং, প্রশিক্ষণ, ফিটনেস, বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, খেলোয়াড় উন্নয়ন ও অবকাঠামো—সবকিছুকে সমন্বিত করার প্রয়োজনীয়তা ছিল সময়ের দাবি।
কোকোর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এই পেশাদার ব্যবস্থাপনার ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া।
অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ও বাংলাদেশের সক্ষমতা
২০০৪ সালে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায়। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও এত বড় আন্তর্জাতিক আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশ এই টুর্নামেন্টের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ পায়। ক্রিকেট অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা ও আয়োজনের সক্ষমতা তুলে ধরার ক্ষেত্রেও এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।
কোকো ছিলেন সেই সময়ের ক্রিকেট প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠকদের একজন।
নীরব মানুষের শেষ বিদায়
২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশে নেমে আসে শোকের ছায়া।
একজন প্রচারবিমুখ মানুষের মৃত্যুর পর তাকে শেষবারের মতো দেখতে মানুষের যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, তা ছিল ব্যাপক।
২৭ জানুয়ারি বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় তার নামাজে জানাজা। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বায়তুল মোকাররমের আশপাশ, পল্টন, দৈনিক বাংলা ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদসংলগ্ন এলাকায়ও বিপুল মানুষের সমাগম ঘটে।
ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকেও অনেকে এসেছিলেন তাকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে।
সেদিনের দৃশ্য যেন একটি প্রশ্ন সামনে এনেছিল—যে মানুষটি জীবদ্দশায় এতটা নীরবে ছিলেন, তার শেষ বিদায়ে এত মানুষের উপস্থিতি কেন?
হয়তো এর উত্তর তার ব্যক্তিত্বের মধ্যেই নিহিত। মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে সবসময় বড় পদ, বড় বক্তব্য কিংবা প্রচারের প্রয়োজন হয় না। বিনয়, আন্তরিকতা ও মানুষের সঙ্গে সহজভাবে মিশে থাকার ক্ষমতাও একজন মানুষকে মানুষের কাছে আপন করে তুলতে পারে।
কোকোর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ
আরাফাত রহমান কোকোর জীবন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে। তার কর্মজীবন নিয়েও ভিন্নমত থাকতে পারে। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মতো তার জীবন নিয়েও আলোচনা ও সমালোচনা থাকবে।
তবে এটিও সত্য যে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অত্যন্ত আলোচিত পরিবারের সদস্য হয়েও ব্যক্তিগত জীবনে অনেকটাই প্রচারবিমুখ ছিলেন।
রাজনীতির সামনে নিজেকে দাঁড় করানোর পরিবর্তে তিনি ক্রীড়াঙ্গণে কাজ করেছেন। ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেও ক্ষমতার প্রদর্শনকে জীবনের মূল লক্ষ্য করেননি—এমন একটি ভাবমূর্তিই তার পরিচিতির অন্যতম অংশ।
তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এই যে, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাকে বারবার হারানোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে—শৈশবে বন্দিত্ব, কৈশোরে পিতৃহারা হওয়া, পরবর্তী জীবনে কারাবাস, দেশত্যাগ এবং শেষ পর্যন্ত প্রবাসের মাটিতে অকালমৃত্যু।
শেষ কথা
আরাফাত রহমান কোকো আজ ইতিহাসের একটি অধ্যায়। মাত্র ৪৫ বছরের জীবনে তিনি দেখেছেন একটি দেশের জন্ম, পরিবারের রাজনৈতিক উত্থান-পতন, পিতার বন্দিত্ব, পিতার মৃত্যু, নিজের কারাবাস, দেশত্যাগ এবং শেষ পর্যন্ত প্রবাসের মাটিতে মৃত্যু।
তিনি হয়তো রাজনীতির মঞ্চে নিয়মিত বক্তৃতা দেননি। ক্ষমতার বড় কোনো পদে বসেননি। নিজের প্রচারের জন্য প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়াননি।
তবুও বাংলাদেশের ক্রিকেটের অবকাঠামো ও খেলোয়াড় উন্নয়নের ইতিহাসে তার সময়ের ভূমিকা আলোচিত হয়ে থাকবে।
আর তার শেষ বিদায়ের সেই জনসমাগমও একটি বার্তা দিয়ে যায়—মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে সবসময় বড় পদ, বড় বক্তব্য কিংবা প্রচারের প্রয়োজন হয় না।
কখনো কখনো নীরবে কাজ করে যাওয়াই মানুষের মনে সবচেয়ে গভীর ছাপ রেখে যায়।
আরাফাত রহমান কোকো ছিলেন নীরবে বেঁচে থাকা এক মানুষ। কিন্তু তার শেষ বিদায় যেন বলে দিয়েছিল—একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পদ নয়; বরং তিনি মানুষের মনে কী রেখে যেতে পেরেছেন।
ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক | সাংবাদিক | কলামিস্ট | বিশ্লেষক
আরাফাত রহমান কোকোর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।