পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে নির্মাণাধীন সেফটিক ট্যাংকের সেন্টারিং খুলতে গিয়ে বাবুরাম দেবসিংহ (নামটি সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রদত্ত) নামে এক নির্মাণশ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বাড়ির মালিকের মামা ও শালডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রাব্বি হোসেনকে প্রধান আসামি করে আটজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। একই ঘটনায় অসুস্থ হয়ে আরেক শ্রমিক গৌতম চন্দ্র রায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অপর শ্রমিক ভাগ্য রায় চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় উপজেলার শালডাঙ্গা ইউনিয়নের অমরখানা জাম্বুরাতলা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত বাবুরাম উপজেলার চিলাহাটি ইউনিয়নের বলরামপুর এলাকার বাসিন্দা।

স্থানীয় সূত্র ও বাড়ির মালিক নবির হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার দিন হেড মিস্ত্রি উত্তম রায়ের নেতৃত্বে বাবুরাম, গৌতম ও ভাগ্য নবির হোসেনের বাড়িতে জানালার কাজ করছিলেন। কাজ শেষে হেড মিস্ত্রির নির্দেশে তিন শ্রমিক নবনির্মিত সেফটিক ট্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করে কাঠের সেন্টারিং খুলতে যান।

প্রথমে বাবুরাম ট্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করার পর অসুস্থ বোধ করছেন বলে জানান। পরে গৌতম ও ভাগ্যও ভেতরে প্রবেশ করলে তারাও শ্বাসকষ্টসহ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় বাড়িতে থাকা নবির হোসেনের মা লাভলী বেগম শ্রমিকদের অসুস্থতার বিষয়টি বুঝতে পেরে চিৎকার শুরু করেন। তাঁর চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে তিন শ্রমিককে ট্যাংকের ভেতর থেকে উদ্ধার করেন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে বাবুরামের মৃত্যু হয়।

নিহতের চাচা বুদ্ধ চরণ দেবসিংহ বাদী হয়ে দেবীগঞ্জ থানায় আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, দীর্ঘদিন ঢাকনা দিয়ে বন্ধ থাকায় সেফটিক ট্যাংকের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস জমে ছিল। কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই শ্রমিকদের সেখানে নামানো হয় এবং তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়ার পরও যথাসময়ে উদ্ধার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা না করায় বাবুরামের মৃত্যু ঘটে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাড়ির মালিক নবির হোসেন। তিনি বলেন, ঘটনার সময় তিনি ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। প্রায় দেড় মাস আগে সংশ্লিষ্ট মিস্ত্রিরাই সেফটিক ট্যাংকটি নির্মাণ করেছিলেন। জানালার কাজ শেষে হেড মিস্ত্রি উত্তম রায়ের নির্দেশেই শ্রমিকরা ট্যাংকের ভেতরে গিয়ে সেন্টারিং খুলছিলেন। তাঁর মা শ্রমিকদের অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পেয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁদের উদ্ধার করেন।

নবির হোসেন আরও বলেন, তিনি কিংবা তাঁর পরিবারের কেউ শ্রমিকদের ট্যাংকের ভেতরে যেতে বাধ্য করেননি। ট্যাংকটি নতুন হওয়ায় সেখানে বিষাক্ত গ্যাস জমে থাকার বিষয়টিও তাঁদের জানা ছিল না। ঘটনার সময় মামলার প্রধান আসামি রাব্বি হোসেনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন না বলে দাবি করেন তিনি।

মামলার প্রধান আসামি রাব্বি হোসেনও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ঘটনার সময় তিনি চিলাহাটি ইউনিয়নের বালাপাড়া এলাকায় ছিলেন। পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, শ্রমিকদের ট্যাংক থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁর দাবি, হেড মিস্ত্রির নির্দেশেই শ্রমিকরা ট্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন এবং এ ঘটনায় তাঁর বা তাঁর পরিবারের কারও দায় নেই।

ঘটনার সময় কর্মরত শ্রমিক ভাগ্য রায় বলেন, সন্ধ্যার দিকে তিনি বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ সময় হেড মিস্ত্রি বাবুরাম ও গৌতমকে সেফটিক ট্যাংকের সেন্টারিং খুলতে বলেন। পরে বাড়ির লোকজনের চিৎকার শুনে তাঁদের উদ্ধারের জন্য তিনি ট্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই শ্বাস নিতে না পেরে তিনিও অচেতন হয়ে পড়েন। জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে হাসপাতালে দেখতে পান তিনি। এর আগে তাঁরা কেউ সেফটিক ট্যাংকের ভেতরে সেন্টারিং খোলার কাজ করেননি বলেও জানান ভাগ্য রায়।

নিহতের চাচা ও মামলার বাদী বুদ্ধ চরণ দেবসিংহের অভিযোগ, বাবুরাম অসুস্থ হওয়ার পর যথাসময়ে তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলে হয়তো তাঁর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতো। দায়িত্বে অবহেলার কারণেই তাঁর ভাতিজার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

দেবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুসা মিয়া বলেন, সেফটিক ট্যাংকের ভেতরে কাজ করতে গিয়ে একজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে।

সেফটিক ট্যাংক কিংবা আবদ্ধ স্থানে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি যে কতটা নীরব অথচ প্রাণঘাতী হতে পারে, দেবীগঞ্জের এই ঘটনাটি যেন তারই আরেকটি নির্মম স্মারক। শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে আবদ্ধ স্থানে প্রবেশের ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ, এ দুর্ঘটনা সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে এনেছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিআইএলএস) ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সেফটিক ট্যাংক ও অন্যান্য আবদ্ধ স্থানে বিষাক্ত গ্যাসে প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে ঘটছে। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সেফটিক ট্যাংক দুর্ঘটনায় ১৩৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও এমন দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে। নিরাপত্তা সরঞ্জামের অপ্রতুলতা, ঝুঁকি সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং যথাযথ সতর্কতার অভাব এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করে থাকেন।

দেবীগঞ্জের এই মৃত্যুও তাই কেবল একটি পরিবারের শোকের গল্প নয়; এটি নির্মাণশ্রমিকদের নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা এবং আবদ্ধ স্থানে কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নিশ্চিত করার এক গভীর বার্তা রেখে গেল।

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}