সরকারের আকার যত বড় হয়, রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতাও কি তত বাড়ে? নাকি মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীর সংখ্যা বাড়তে বাড়তে একসময় প্রশাসনিক সমন্বয়ই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ?

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণকে ঘিরে এখন এমন প্রশ্নই সামনে এসেছে। নতুন কয়েকজন সদস্য যুক্ত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের মন্ত্রিসভার আকার দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। এর মধ্যে পূর্ণমন্ত্রী ২৬ জন এবং প্রতিমন্ত্রী ২৪ জন। এর বাইরে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন পদমর্যাদায় বিশেষ সহকারীরাও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রশাসনের কাজে গতিশীলতা আনতেই এই সম্প্রসারণ। যুক্তিটি একেবারে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর নতুন সরকারকে একসঙ্গে অনেকগুলো প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। দায়িত্বের চাপ ভাগ করে নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী প্রয়োজন হতে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- দায়িত্ব ভাগ করা আর দায়িত্বের স্তর বাড়ানো কি একই বিষয়?

একটি মন্ত্রণালয়ে একজন মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী এবং একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দায়িত্ব পালন করলে তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা ও কর্তৃত্বের সীমা কতটা পরিষ্কার? কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য হলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন কে? রাজনৈতিক নির্দেশনা, নীতিনির্ধারণ এবং প্রশাসনিক বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় করবেন কে?

রাষ্ট্র পরিচালনায় এই প্রশ্নগুলো মোটেই ছোট নয়। একটি সরকারে পদ যত বাড়ে, স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশাও বাড়ে। কিন্তু পদসংখ্যা বাড়লেই প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়বে- এমন কোনো সরল সমীকরণ নেই। বরং দক্ষতা নির্ভর করে সঠিক মানুষকে সঠিক দায়িত্ব দেওয়ার ওপর, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কতটা স্পষ্ট তার ওপর এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রশাসন কতটা দ্রুত ও জবাবদিহিমূলকভাবে কাজ করছে তার ওপর।

একই মন্ত্রণালয়ে একাধিক দায়িত্বশীল- সুবিধা নাকি জটিলতা?

বর্তমান মন্ত্রিসভার কাঠামোতে কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ে পূর্ণমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাও দায়িত্ব পালন করছেন। আবার কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একজন মন্ত্রীর হাতেই রয়েছে।

এই পার্থক্যই মূলত আলোচনার জন্ম দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কথা বলা যায়। এখানে পূর্ণমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার দায়িত্ব রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও পূর্ণমন্ত্রীর পাশাপাশি একাধিক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণের মতো মন্ত্রণালয়েও একাধিক পর্যায়ের রাজনৈতিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি রয়েছেন।

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় একজন করে মন্ত্রীর নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে।

এখানে প্রশ্নটি মন্ত্রী বেশি না কম- সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, কাজের পরিধি অনুযায়ী দায়িত্ব বণ্টনের যুক্তি কতটা স্পষ্ট?

যদি একটি বড় মন্ত্রণালয়ের কাজের চাপ একজন মন্ত্রীর পক্ষে সামলানো কঠিন হয়, তাহলে সেখানে একজন দক্ষ প্রতিমন্ত্রী থাকা যৌক্তিক। কিন্তু একই সঙ্গে উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারীসহ একাধিক রাজনৈতিক স্তর যুক্ত হলে তাঁদের দায়িত্বের সীমারেখা স্পষ্ট না থাকলে সমন্বয়ের বদলে প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে।

প্রশাসনের সবচেয়ে বড় সমস্যা তখনই হয়, যখন একই কাজের জন্য একাধিক নির্দেশনা তৈরি হয়।

বড় সরকার মানেই কি দক্ষ সরকার?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বর্তমান মন্ত্রিসভাই সবচেয়ে বড়- এমন দাবি করার সুযোগ নেই। অতীতেও এর চেয়ে বড় মন্ত্রিসভা দেখা গেছে। ফলে শুধু সদস্যসংখ্যা দিয়ে বর্তমান সরকারকে বিচার করা সঠিক হবে না।

কিন্তু সময় বদলেছে। এখন রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জনগণের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। নাগরিকরা শুধু মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সংখ্যা জানতে চান না; তাঁরা জানতে চান- দ্রব্যমূল্য কমবে কি না, কর্মসংস্থান বাড়বে কি না, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হবে কি না, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট কমবে কি না, ব্যাংকিং খাতের আস্থা ফিরবে কি না এবং প্রশাসনে দুর্নীতি ও হয়রানি কমবে কি না।

অর্থাৎ জনগণের কাছে সরকারের সাফল্যের মাপকাঠি চেয়ার নয়, ফলাফল।

একজন দক্ষ মন্ত্রী যদি একটি মন্ত্রণালয় কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারেন, সেখানে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আরও কয়েকটি রাজনৈতিক পদ সৃষ্টি করলে সরকারের সক্ষমতা বাড়বে- এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার একটি মন্ত্রণালয়ের কাজ যদি বিশাল হয়, তাহলে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন হতে পারে। সুতরাং মূল বিষয় হলো কাঠামোর যৌক্তিকতা।

সমন্বয়হীনতার ঝুঁকি

একই মন্ত্রণালয়ে একাধিক রাজনৈতিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি থাকলে সবচেয়ে বড় যে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, সেটি হলো সমন্বয়হীনতা।

ধরা যাক, কোনো নীতিগত বিষয়ে মন্ত্রীর এক ধরনের মত, প্রতিমন্ত্রীর আরেক ধরনের মত এবং উপদেষ্টার তৃতীয় ধরনের পরামর্শ। তখন সংশ্লিষ্ট সচিব ও কর্মকর্তারা কোন নির্দেশনা অনুসরণ করবেন?

আবার কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থতা দেখা দিলে দায়ভার কার ওপর বর্তাবে?

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ জবাবদিহি যদি অস্পষ্ট হয়, তাহলে প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় সহজেই একে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।

তবে উপদেষ্টার পদ নিজেই যে অপ্রয়োজনীয়- তা বলা যাবে না। একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ উপদেষ্টা সরকারকে নীতি প্রণয়ন, গবেষণা, সমন্বয় ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিতে পারেন। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন উপদেষ্টার ভূমিকা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও সচিবের সাংবিধানিক-প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সংঘর্ষে যায়।

রাজনীতি বনাম প্রশাসনিক দক্ষতা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মন্ত্রিসভা শুধু প্রশাসনিক কাঠামো নয়; এটি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। দলীয় ভারসাম্য, জোটের প্রতিনিধিত্ব, অঞ্চলভিত্তিক প্রত্যাশা, অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক আনুগত্য- সবকিছুর প্রভাব মন্ত্রিসভা গঠনে থাকে। এটি গণতান্ত্রিক রাজনীতির বাস্তবতা।

কিন্তু রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে যদি প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশ্নটি দ্বিতীয় সারিতে চলে যায়, তাহলে সমস্যা তৈরি হতে পারে। কারণ মন্ত্রণালয় পরিচালনা রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার মতো সহজ বিষয় নয়। এর সঙ্গে বাজেট, আইন, নীতি, প্রশাসন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত।

তাই একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হওয়া উচিত- সততা, দক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং জবাবদিহির মানসিকতা।

সরকারের সামনে এখন বড় পরীক্ষা

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য মন্ত্রিসভার এই সম্প্রসারণ এখন একটি বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র। কারণ জনগণ নতুন সরকারের কাছে পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছে।

সরকারের সামনে অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ-জ্বালানি এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

এসব ক্ষেত্রে যদি নতুন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টারা নিজেদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করতে পারেন, তাহলে বড় মন্ত্রিসভা সরকারের সক্ষমতা বাড়ানোর একটি কার্যকর উপায় হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।

কিন্তু যদি পদ বাড়ে, দায়িত্ব বাড়ে, অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ধীর হয় এবং একাধিক নির্দেশনার কারণে প্রশাসন বিভ্রান্ত হয়, তাহলে এই সম্প্রসারণই সরকারের জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

শেষ কথা

সরকারের শক্তি মন্ত্রিসভার আকারে নয়; সরকারের শক্তি তার সিদ্ধান্তের গুণগত মান, বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিতে।

মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টার সংখ্যা যতই বাড়ুক, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় যদি ইতিবাচক পরিবর্তন না আসে, তাহলে সেই বড় কাঠামোর রাজনৈতিক মূল্য খুব বেশি হবে না।

অন্যদিকে, যদি নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিজেদের মধ্যে সমন্বয় রেখে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, প্রশাসনকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারেন এবং জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে পারেন, তাহলে এই সম্প্রসারণের যৌক্তিকতা প্রমাণিত হবে।

তাই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- সরকারে চেয়ার কতটি, সেটি নয়; সেই চেয়ারগুলোতে বসে কতটা কাজ হচ্ছে, সেটিই আসল।

কারণ শেষ পর্যন্ত জনগণ মন্ত্রিসভার আকার দিয়ে সরকারকে বিচার করবে না। জনগণ বিচার করবে- সরকার তাদের জন্য কী করেছে।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

Facebook Comments Box
#wpdevar_comment_1 span,#wpdevar_comment_1 iframe{width:100% !important;} #wpdevar_comment_1 iframe{max-height: 100% !important;}