রাজধানীর তিন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ, উত্তেজনায় দিনভর অচলাবস্থা
রাজধানীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ এবং সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় একই দিনে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পৃথক স্থানে সংঘটিত এসব ঘটনায় দুই সংগঠনের নেতাকর্মী, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং কয়েকজন পথচারী আহত হন। আহতদের রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
বিকেলে সায়েন্সল্যাব মোড় ও ঢাকা কলেজ সংলগ্ন এলাকায় দুই ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা মুখোমুখি অবস্থান নিলে উত্তেজনা দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত একটি আলোচনা সভার প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে প্রথমে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, লাঠিসোঁটা নিয়ে সংঘর্ষ এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষের সময় ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষার্থী নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি করেন। পরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা কলেজের মূল ফটক ও নায়েম সড়কে অবস্থান নেন। অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরাও আশপাশের বিভিন্ন মোড়ে অবস্থান নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে।
ঘটনার পর দুই সংগঠনই পরস্পরের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ তোলে। ছাত্রশিবিরের দাবি, তাদের কর্মসূচিতে বাধা দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে এবং বহু নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। অন্যদিকে ছাত্রদলের অভিযোগ, তাদের ওপর পূর্বপরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে এবং আত্মরক্ষার্থেই তারা অবস্থান নিয়েছেন।
একই দিনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং বহু শিক্ষার্থী আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
আহতদের ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেও কয়েক দফা উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। হাসপাতাল চত্বরে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হাসপাতাল এলাকায় অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, সংঘর্ষের সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (জকসু) ভিপি ও জিএসকেও ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় অন্তত ২০ থেকে ৩০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, আদালতপাড়া এবং হাসপাতাল এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজের ঘটনার প্রভাব পড়ে বকশিবাজারের সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা এলাকায়ও। বিকেলের দিকে সেখানে দুই ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে অবস্থান নিলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে সেখানে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় আহত কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে ছাত্রদলের দুই নেতাও রয়েছেন। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
আহতদের একজন অভিযোগ করেন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। হামলায় লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল ব্যবহার করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে হলের সিট দখল ও সাংগঠনিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধ থেকেই এ ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
তিনটি ঘটনার পর রাজধানীর সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাস, হাসপাতাল এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
এদিকে একই দিনে রাজধানীর তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের ঘটনায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা দ্রুত পরিস্থিতি শান্ত করে শিক্ষাঙ্গনে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।














