বদলি, নাকি আইওয়াশ, হেড অফিসেই শাহীনুর রহমান
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের কর্মকর্তা মো. শাহীনুর রহমানকে ঘিরে বিভিন্ন অনিয়ম, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, ভাতা সংক্রান্ত অনিয়মসহ নানা অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তাকে এখনো ট্রাস্টের প্রধান কার্যালয়েই দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি জারি করা নতুন অফিস আদেশেও তাকে প্রধান কার্যালয়, ঢাকায় প্রশাসন অনুবিভাগের সঙ্গে সংযুক্ত রাখার তথ্য পাওয়া গেছে।
এতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে- এটি কি প্রকৃত বদলি, নাকি শুধু ‘আইওয়াশ’? অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, এত অভিযোগ ও তদন্তের দাবি ওঠার পরও কেন তাকে চট্টগ্রাম কিংবা ট্রাস্টের অন্য কোনো কার্যালয়ে দায়িত্ব দেওয়া হলো না?
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের প্রশাসন বিভাগের জারি করা এক অফিস আদেশে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক প্রয়োজনে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িকভাবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ওই আদেশে মো. শাহীনুর রহমানের নামও রয়েছে।
আদেশে তাকে কল্যাণ ও গবেষণা অনুবিভাগের উপ-সহকারী পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করে প্রশাসন অনুবিভাগে সংযুক্ত, ট্রাস্ট প্রধান কার্যালয়, ঢাকার দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।
বদলি, নাকি শুধু দায়িত্বের রদবদল?
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে যখন একাধিক অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে এবং এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে, তখন তাকে কেন প্রধান কার্যালয়েই রাখা হচ্ছে?
তাদের বক্তব্য, কাউকে অভিযোগের ভিত্তিতে আগেই দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয়। অভিযোগ সত্য না মিথ্যা—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। তবে তদন্তের প্রয়োজন থাকলে তদন্ত চলাকালে প্রশাসনিক প্রয়োজনে তাকে অন্য কোনো দায়িত্বে কিংবা ট্রাস্টের চট্টগ্রামসহ অন্য কোনো কার্যালয়ে দায়িত্ব দেওয়া যায় কি না, সেটিও কর্তৃপক্ষের বিবেচনা করা উচিত।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন- যদি বদলির প্রশাসনিক সুযোগ থাকে, তাহলে শাহীনুর রহমানকে হেড অফিসেই রাখার কারণ কী?
চট্টগ্রাম বা অন্যত্র নয় কেন?
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কর্তৃপক্ষ চাইলে তাকে সাময়িকভাবে অন্যত্র দায়িত্ব দিতে পারে। তাদের প্রশ্ন, চট্টগ্রাম কিংবা ট্রাস্টের অন্য কোনো কার্যালয়ে তাকে বদলি করার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না। যদি কর্তৃপক্ষ মনে করে তার বর্তমান দায়িত্বে থাকার প্রয়োজন রয়েছে, তাহলে সেই প্রশাসনিক প্রয়োজনের কারণও স্পষ্ট করা উচিত বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।
ভাতা ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ
মো. শাহীনুর রহমানকে ঘিরে মুক্তিযোদ্ধাদের বকেয়া ভাতা পরিশোধে অনিয়ম, অর্থ কেটে রাখার অভিযোগ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার, সরকারি আবাসন ব্যবহারে অনিয়ম এবং দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার মতো বিভিন্ন অভিযোগের কথা তুলে ধরেছেন অভিযোগকারীরা। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা কোনো চূড়ান্ত তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে- এমন দাবি করা হচ্ছে না। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতেই নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হচ্ছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা সংক্রান্ত কোনো অনিয়মের অভিযোগ সত্য হয়ে থাকলে তা গুরুতর বিষয়। আবার অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হলে তদন্তের মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অবস্থানও পরিষ্কার হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
নতুন অফিস আদেশে কী বলা হয়েছে?
১৭ সেপ্টেম্বরের অফিস আদেশে বলা হয়েছে, পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক প্রয়োজনে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তাদের নামের পাশে উল্লেখিত দপ্তর, শাখা বা প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। ওই তালিকায় মো. শাহীনুর রহমানের নাম রয়েছে। তার পদ উপ-সহকারী পরিচালক, কল্যাণ ও গবেষণা অনুবিভাগ। পাশাপাশি তার অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে আইসিটি শাখার কথা উল্লেখ রয়েছে এবং আদেশে তাকে প্রশাসন অনুবিভাগে সংযুক্ত, ট্রাস্ট প্রধান কার্যালয়, ঢাকা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অফিস আদেশে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশনাও রয়েছে।
তদন্ত হয়েছে কি?
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, মো. শাহীনুর রহমানকে নিয়ে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে ট্রাস্টের পক্ষ থেকে কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত হয়েছে কি না। যদি তদন্ত হয়ে থাকে, তদন্তের ফলাফল কী, যদি তদন্ত না হয়ে থাকে, তাহলে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি? আর তদন্তের প্রয়োজন থাকলে তাকে প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বে রাখার কারণই বা কী? অভিযোগকারীরা বলছেন, তদন্ত ছাড়া অভিযোগকে সত্য বা মিথ্যা- কোনোটিই ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। তবে একই সঙ্গে অভিযোগ ওঠার পর কর্তৃপক্ষের অবস্থানও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগকারীরা বলছেন, তাদের উদ্দেশ্য কাউকে পূর্বধারণার ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত করা নয়। তারা চান অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক, আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অবস্থানও পরিষ্কার করা হোক। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলোর বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।
এখন মূল প্রশ্ন- নতুন অফিস আদেশটি কি প্রকৃতপক্ষে বদলি, নাকি শুধু দায়িত্বের রদবদল? এত অভিযোগ ও তদন্তের দাবি ওঠার পরও কেন হেড অফিসেই মো. শাহীনুর রহমান—চট্টগ্রাম বা ট্রাস্টের অন্য কোনো কার্যালয়ে তাকে দায়িত্ব না দেওয়ার কারণ কী, সেই জবাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেই প্রত্যাশা করছেন অভিযোগকারীরা।





















